Full Text
نয়না (Ophthalmology)
চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেই বিশেষ শাখা যেখানে চোখ, দর্শন ব্যবস্থা এবং এর সাথে সম্পর্কিত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিষয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে চক্ষুরোগবিজ্ঞান বা অফথ্যালমোলজি বলে। এই শাখার চিকিৎসকদের চক্ষুবিশেষজ্ঞ বা অফথ্যালমোলজিস্ট বলা হয়।
**চোখের প্রধান কাজ:**
* **দৃষ্টি (Vision):** আলো গ্রহণ করে মস্তিষ্ককে দৃশ্যমান তথ্য সরবরাহ করা।
* **রঙের উপলব্ধি (Color Perception):** বিভিন্ন রঙের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হওয়া।
* **গভীরতা উপলব্ধি (Depth Perception):** বস্তুর দূরত্ব ও অবস্থান বুঝতে সাহায্য করা।
* **সুরক্ষা (Protection):** ক্ষতিকারক বস্তু বা আলো থেকে চোখকে রক্ষা করা।
**চোখের প্রধান অংশগুলো ও তাদের কাজ:**
1. **কর্নিয়া (Cornea):** চোখের সামনের স্বচ্ছ, গোলাকার অংশ যা আলোকরশ্মিকে চোখের ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং চোখের ফোকাসিং ক্ষমতার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
2. **আইরিস (Iris):** কর্নিয়ার পেছনে অবস্থিত রঙিন অংশ যা পিউপিলের আকার নিয়ন্ত্রণ করে, এর ফলে চোখে প্রবেশকারী আলোর পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হয়।
3. **পিউপিল (Pupil):** আইরিসের কেন্দ্রে অবস্থিত কালো ছিদ্র যা দিয়ে আলোকরশ্মি চোখের ভেতরে প্রবেশ করে।
4. **লেন্স (Lens):** পিউপিলের পেছনে অবস্থিত স্বচ্ছ গঠন যা আলোকরশ্মিকে রেটিনার উপর ফোকাস করতে সাহায্য করে।
5. **রেটিনা (Retina):** চোখের পেছনের অংশে অবস্থিত আলোক-সংবেদনশীল টিস্যু স্তর যা আলোকরশ্মিকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে।
* **রড কোষ (Rod Cells):** কম আলোতে দেখতে সাহায্য করে।
* **কোন কোষ (Cone Cells):** উজ্জ্বল আলোতে এবং রঙের পার্থক্য করতে সাহায্য করে।
6. **অপটিক নার্ভ (Optic Nerve):** রেটিনা থেকে বৈদ্যুতিক সংকেত মস্তিষ্কে প্রেরণ করে, যা মস্তিষ্ককে সেই সংকেতগুলোকে চিত্রে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে।
7. **ভিট্রিয়াস হিউমার (Vitreous Humor):** লেন্স ও রেটিনার মধ্যবর্তী স্থানকে পূর্ণ করে রাখা জেলিসদৃশ পদার্থ যা চোখের আকৃতি বজায় রাখে।
8. **অ্যাকুয়াস হিউমার (Aqueous Humor):** কর্নিয়া ও আইরিসের মধ্যবর্তী স্থানকে পূর্ণ করে রাখা স্বচ্ছ তরল যা চোখকে পুষ্টি সরবরাহ করে।
9. **স্ক্লেরা (Sclera):** চোখের সাদা, শক্ত বাইরের আবরণ যা চোখকে সুরক্ষা দেয়।
10. **কোরয়েড (Choroid):** স্ক্লেরা ও রেটিনার মধ্যবর্তী স্তরে অবস্থিত রক্তনালী সমৃদ্ধ টিস্যু যা রেটিনাকে পুষ্টি সরবরাহ করে।
11. **কনজাংটিভা (Conjunctiva):** চোখের সাদা অংশ এবং চোখের পাতার ভেতরের অংশকে আবৃত করে রাখা পাতলা, স্বচ্ছ ঝিল্লি।
12. **ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড (Lacrimal Gland):** চোখের পানি উৎপন্ন করে চোখকে আর্দ্র ও পরিষ্কার রাখে।
**কিছু সাধারণ চোখের রোগ ও সমস্যা:**
* **ছানি (Cataract):** চোখের লেন্স অস্বচ্ছ হয়ে যাওয়া, যার ফলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়।
* **গ্লুকোমা (Glaucoma):** অপটিক নার্ভের ক্ষতির কারণে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, যা প্রায়শই চোখের উচ্চ অভ্যন্তরীণ চাপের সাথে যুক্ত।
* **ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি (Diabetic Retinopathy):** ডায়াবেটিসের কারণে রেটিনার রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
* **ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (Macular Degeneration):** রেটিনার ম্যাকুলা অংশের ক্ষতি, যা কেন্দ্রীয় দৃষ্টিকে প্রভাবিত করে।
* **রিফ্র্যাক্টিভ এরর (Refractive Errors):**
* **মায়োপিয়া (Myopia/Short-sightedness):** দূরের জিনিস দেখতে অসুবিধা।
* **হাইপারোপিয়া (Hyperopia/Long-sightedness):** কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা।
* **অ্যাস্টিগমাটিজম (Astigmatism):** চোখে প্রবেশকারী আলোকরশ্মি রেটিনার উপর সঠিকভাবে ফোকাস না হওয়া, যার ফলে দৃষ্টি বিকৃত হয়।
* **প্রেসবিয়োপিয়া (Presbyopia):** বয়সের সাথে সাথে কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা।
* **কনজাংটিভাইটিস (Conjunctivitis/Pink Eye):** কনজাংটিভার প্রদাহ, যা লালভাব, চুলকানি এবং পানি পড়ার কারণ হয়।
* **শুষ্ক চোখ (Dry Eye Syndrome):** চোখের পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি উৎপাদন না করা বা চোখের পানির গুণগত মান খারাপ হওয়া।
* **অঞ্জনী (Stye):** চোখের পাতার প্রান্তে বা ভেতরে ছোট, বেদনাদায়ক ফুসকুড়ি।
**চোখের যত্নের জন্য কিছু টিপস:**
* নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা করানো।
* স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা (ভিটামিন এ, সি, ই, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড)।
* পর্যাপ্ত ঘুম।
* কম্পিউটার বা ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘক্ষণ কাজ করার সময় বিরতি নেওয়া (২০-২০-২০ নিয়ম: প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ ফুট দূরে ২০ সেকেন্ডের জন্য তাকানো)।
* সূর্যালোকে বাইরে যাওয়ার সময় সানগ্লাস ব্যবহার করা।
* ধূমপান ত্যাগ করা।
* চোখকে ঘষা বা স্পর্শ করা এড়ানো।
* কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীদের সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
চোখ আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান অঙ্গগুলির মধ্যে একটি, এবং এর যত্ন নেওয়া অপরিহার্য।